
কর্ণফুলী নদীর তীরে টানা তিন দিন ছিল শুধু অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনা। জীবিত অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষীণ আশায় বুক বেঁধে ছিলেন পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো গভীর শোকে—নিখোঁজ কিশোর রিয়াদুল হক জিসান (১৫) ফিরল নিথর দেহ হয়ে। ঘটনার প্রায় ৭৭ ঘণ্টা পর বুধবার রাতে কর্ণফুলী নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার বিকেলে কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা সী-রিসোর্স গ্রুপের মালিকানাধীন ফিশিং জাহাজ ‘এফবি এগ্রো ফুড–৪’ থেকে মাছ ক্রয় করে মনির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মাছ আনলোড করার সময় জাহাজ থেকে সাম্পানে মাছ নামাতে গিয়ে মই ব্যবহার করা হয়। এ সময় অসাবধানতাবশত জিসান ও সাদ্দাম (২৪) নামের দুই শ্রমিক পা পিছলে নদীতে পড়ে যান।
ঘটনাস্থলে থাকা অন্য শ্রমিকরা দ্রুত সাদ্দামকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও কর্ণফুলী নদীর প্রবল স্রোতের কবলে পড়ে জিসান মুহূর্তেই তলিয়ে যায়। চোখের সামনে হারিয়ে যায় একটি তরতাজা কিশোর জীবন।
নিখোঁজ জিসানের চাচা জাকির হোসেন সবুজ জানান, মাছ আনলোডের সময় জাহাজের সিঁড়ি থেকে নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় জিসান। “আমরা তিন দিন ধরে খুঁজেছি। অবশেষে জেলেদের জালে ভেসে ওঠা মরদেহ দেখে আমরা শনাক্ত করি—সে আমাদের জিসান,” বলেন তিনি।
নিখোঁজের পরপরই স্থানীয়রা, নৌযান শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অনুসন্ধান চালানো হলেও প্রথম তিন দিন কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রতিটি মুহূর্ত যেন পরিবারের জন্য আরও ভারী হয়ে উঠছিল। নদীর পাড়ে বসে মা–বাবা, স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকিয়ে ছিলেন কর্ণফুলীর দিকে—এই বুঝি ভেসে উঠবে প্রিয় মুখটি। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, আশার আলো ততই নিভে গেছে।
অবশেষে মঙ্গলবার রাতের দিকে কর্ণফুলী নদীর বিএসসি–৯ নম্বর ঘাট এলাকায় জেলেদের জালে একটি মরদেহ ভেসে ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা এসে মরদেহটি রিয়াদুল হক জিসান বলে শনাক্ত করেন। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে জানাজা ও স্থানীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, নিহত জিসানের পিতা মো. হেলাল ছেলেকে পড়াশোনার জন্য একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। তবে পড়ালেখায় অনাগ্রহ এবং পারিবারিক শাসনের ভয়ে জিসান অল্প বয়সেই শ্রমিকের কাজে যুক্ত হয় বলে জানা গেছে। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামা এই কিশোরের পরিণতি আজ আরও গভীর বেদনার জন্ম দিয়েছে।
এলাকাবাসী ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে কর্ণফুলী উপজেলার ইছানগর গ্রাম। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলছেন,
“জিসান আমাদের সন্তানের মতো ছিল। তিন দিন ধরে অপেক্ষা করেছি—জীবিত ফিরবে ভেবে। কিন্তু নদী আমাদের সব আশা ভেঙে দিল।”
সব মিলিয়ে, কিশোর জিসানের মৃত্যু কর্ণফুলী নদীর বুকে লেখা হয়ে থাকল আরেকটি হৃদয়বিদারক অধ্যায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যে কিশোর নদীতে নেমেছিল, সে ফিরল নিথর দেহ হয়ে—তার গল্প কাঁদাচ্ছে শুধু একটি পরিবার নয়, কাঁদাচ্ছে পুরো কর্ণফুলী পাড়।



