বছরের শেষ প্রান্তে এসে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য স্বস্তির সময় হওয়ার কথা—বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, পড়াশোনার টানা চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি। এই সময়টুকু সাধারণত খেলাধুলা, সৃজনশীল চর্চা ও পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মতো ছোট এলাকাতেও বেসরকারি উদ্যোগে একের পর এক ‘মেধা যাচাই’ ও ‘বৃত্তি পরীক্ষা’ আয়োজন করে শিশুদের ওপর নতুন করে পরীক্ষার চাপ তৈরি করা হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক শৈশব ও মানসিক বিকাশকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বৃত্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয় মেধাবী শিক্ষার্থী নির্বাচন ও উৎসাহ প্রদান। তবে অভিভাবকদের অভিযোগ, বাস্তবে এসব পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রেজিস্ট্রেশন ফি, প্রস্তুতি বই বিক্রি, কোচিং ক্লাস ও নানা আনুষঙ্গিক খরচ। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট বই বা কোচিং প্যাকেজ নিতে হয়। ফলে ‘বৃত্তি’ নামের আড়ালে এসব আয়োজন অনেকটাই আর্থিক লাভের উৎসে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বছরের শেষ দিকে পরীক্ষার পর শিশুদের মানসিক বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিনের পড়াশোনার ক্লান্তি কাটাতে এই সময়টুকু না পেলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, বিরক্তি ও ব্যর্থতার ভয় বাড়তে পারে। একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে অনেক শিশু আত্মবিশ্বাস হারায়, পড়াশোনাকে আনন্দ নয় বরং চাপের বিষয় হিসেবে দেখতে শেখে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এসব বৃত্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও মান। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ, বৃত্তির পরিমাণ কিংবা নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্টভাবে জানানো হয় না। কোথাও আবার অধিকসংখ্যক ‘মেধাবী’ ঘোষণা করে পরীক্ষাকে আকর্ষণীয় করা হলেও প্রকৃত বৃত্তির সংখ্যা ও আর্থিক সহায়তা খুব সীমিত থাকে। এতে করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
শিক্ষাবিদদের মতে, মেধা যাচাই প্রয়োজন হলেও তা হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে, বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। যত্রতত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের ফলে শিক্ষা ক্রমেই বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে। এতে নম্বর, সার্টিফিকেট ও পদকের পেছনে ছোটা বাড়লেও সৃজনশীলতা, নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক সুস্থতা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চিত্র এই সমস্যারই একটি উদাহরণ। ছোট একটি উপজেলায় চলতি ডিসেম্বর মাসেই ছয়টির বেশি বৃত্তি ও মেধা যাচাই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কর্ণফুলী মেধা অন্বেষণ, কর্ণফুলী কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন মেধা বৃত্তি, আয়ুব বিবি ট্রাস্ট মেধা বৃত্তি, আলাভী মেধা মূল্যায়ন, হালিম-লিয়াকত মেধা বৃত্তি ও আ’লা হযরত মেধা বৃত্তির মতো আয়োজনগুলো শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা ও চাপ সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার নামে অতিরিক্ত পরীক্ষার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, পরীক্ষার পর শিশুদের খেলাধুলা, বই পড়া, শিল্পচর্চা ও পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগ দিলে তারা মানসিকভাবে আরও সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। শিক্ষাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করার সুযোগ তৈরি না হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
তবে বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন কর্ণফুলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ডঃ বাবু চন্দ্রনাথ। তিনি জানান, "বাৎসরিক পরীক্ষার জন্য সিলেবাস ভিত্তিক যে প্রস্তুতি শিক্ষার্থীরা নেই তাতেই হচ্ছে বৃত্তি পরীক্ষা। সরকারি বৃত্তি পরীক্ষার ফি বেশি হওয়াতে অনেক শিক্ষার্থী তাতে অংশগ্রহণ করার মত সামর্থ্য থাকে না। তবে আনুপাতিক হারে বেসরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় ফি কম হওয়াতে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিতে পারছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি কোন চাপ সৃষ্টি হয় বলে বলা যাচ্ছে না।"
সরজমিনে দেখা যায়, বেসরকারি সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদেরকে দুই থেকে আড়াইশো করে ফি আদায় করে। উপরন্তর বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকেও ডোনেশন নিয়ে থাকে। প্রতিটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—এসব বৃত্তি পরীক্ষা সত্যিই কি শিশুদের মেধা যাচাইয়ের জন্য, নাকি এর আড়ালে গড়ে উঠছে একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা? নীতিনির্ধারক, শিক্ষা প্রশাসন ও অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ কমানো কঠিন। শিশুদের শৈশব ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় রেখে এখনই এ বিষয়ে সচেতন ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।