বিশ্বের কোটি কোটি ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী মানুষ আজ অপেক্ষায় আছেন তাঁদের নতুন ধর্মীয় নেতার আগমনের জন্য। সদ্য প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসকে সম্মানের সঙ্গে সমাহিত করার পর ভ্যাটিকানে শুরু হয়েছে নতুন পোপ নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কনক্লেভ’, যার অর্থ হলো ‘তালাবদ্ধ কক্ষে সভা’। ভ্যাটিকানের বিখ্যাত সিস্টিন চ্যাপেলের ভেতরে কার্ডিনালদের এই গোপন বৈঠকেই নির্ধারিত হবে কে হবেন ক্যাথলিক চার্চের পরবর্তী পোপ।
পোপ নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কার্ডিনালরা 'জেনারেল কংগ্রিগেশন'-এ মিলিত হবেন, যেখানে তাঁরা ক্যাথলিক চার্চের সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন। অতীতের তুলনায় এবারকার কনক্লেভে বৈচিত্র্যের ছাপ স্পষ্ট। বর্তমান কার্ডিনাল কলেজের সদস্যরা বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নিয়োগ পেয়েছেন সদ্য প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসের হাত ধরে। ফলে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন নির্বাচন।
৮০ বছরের কম বয়সী ১৩৮ জন কার্ডিনাল ভোট প্রদানের জন্য যোগ্য। সিস্টিন চ্যাপেলে প্রবেশের আগে তাঁদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হবে, থাকবে ইলেকট্রনিক জ্যামিং ডিভাইস। "Come Holy Spirit" গান গেয়ে এবং গোপনীয়তার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে কনক্লেভ শুরু হবে। এরপর "Extra Omnes" (সবাই বের হয়ে যাও) ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাহ্যিক বিশ্বের সঙ্গে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
ভোটার কার্ডিনালরা একটি গোপন ব্যালটে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে নির্বাচিত হবেন নতুন পোপ। যদি প্রথম ব্যালটে সফলতা না আসে, প্রতিদিন চারবার পর্যন্ত ব্যালট অনুষ্ঠিত হতে পারে। ব্যালট শেষে যদি কালো ধোঁয়া দেখা যায়, বুঝতে হবে নির্বাচন চলমান। আর সাদা ধোঁয়া দেখা মানেই বিশ্ব নতুন পোপ পেয়েছে।
একজন পোপ নির্বাচিত হলে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে, "আপনি কি পোপ হিসেবে নির্বাচিত হওয়া মেনে নিচ্ছেন?" — তিনি যদি সম্মত হন এবং "Accepto" বলেন, তখনই তিনি নতুন পোপ হয়ে যাবেন। এরপর তিনি নিজের জন্য একটি নাম নির্বাচন করবেন, যা তাঁর মিশন এবং দর্শনের প্রতীক হয়ে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, জর্জ মারিও বার্গোগলিও 'ফ্রান্সিস' নাম গ্রহণ করেছিলেন সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
নতুন পোপকে এরপর 'রুম অফ টিয়ার্স' বা 'অশ্রু কক্ষে' নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে আবেগঘন মুহূর্তে তিনি সাদা পোশাক পরিধান করবেন। তারপর সেন্ট পিটার্স বাসিলিকার ব্যালকনি থেকে বিশ্বের প্রতি প্রথম আশীর্বাদ প্রদান করবেন। এই ঐতিহাসিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবে বিশ্বের কোটি কোটি ক্যাথলিক বিশ্ববাসী, যাদের হৃদয়ে জন্ম নেবে নতুন আশা, নতুন দিকনির্দেশনা।
নতুন পোপ শুধু ক্যাথলিক চার্চের প্রধান নন, তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে, আন্তধর্মীয় সংলাপে এবং নৈতিক নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পোপ ফ্রান্সিসের উত্তরসূরি তাঁর উত্তরাধিকার ধরে রাখবেন নাকি নতুন কোনো দিকনির্দেশনা তৈরি করবেন—তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ভ্যাটিকান থেকে আবারও বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে উঠে আসবে নতুন এক কণ্ঠ, যিনি শান্তি, মানবতা এবং বিশ্বাসের বার্তা ছড়িয়ে দেবেন।