
চট্টগ্রামের ধলঘাট ইউনিয়নের তেকোটা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৫ সালের ১৯ মে জন্মগ্রহণ করেন বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ। তার পিতা মনোহর আলী ও মাতা ছবুরা খাতুন ছিলেন সৎ, আদর্শবান ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, সাহসী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। স্থানীয় গৈড়লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পরে গৈড়লা কে.পি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, পটিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়–এ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম আইন কলেজে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তরুণ ফজল আহমদ দেশের স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ন্যাপ–কমিউনিস্ট পার্টি–ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নেন। কেলিশহর গোপাপাড়া, ধলঘাট রেলস্টেশন দখল, বোয়ালখালী কালাইয়ার হাট রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ, ইন্দ্রপোল সেতু ধ্বংস এবং ঐতিহাসিক গৈড়লার টেকের সম্মুখযুদ্ধে তার সাহসিকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব যুদ্ধে পাকবাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু অস্ত্র গেরিলা বাহিনীর দখলে আসে। বিশেষ করে ৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়, যা স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রগঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কর্মজীবনের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে চাকরি নিলেও পরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে তিনি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এ যোগদান করেন এবং সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে যুগ্ম পরিচালক পদ থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি জেসমিন আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তাদের চার কন্যা সন্তানের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতা কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ায় নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা—এই দীর্ঘ পথচলায় ফজল আহমদ দেশের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার জীবনকাহিনি নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, সংগ্রাম ও সততার এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



