একটি শহর। একের পর এক দীর্ঘ মিছিল। মুহূর্তেই থমকে যাওয়া ব্যস্ত সড়ক। বাতাসজুড়ে স্লোগানের প্রতিধ্বনি, মানুষের উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ। যে চট্টগ্রাম প্রতিদিন বন্দর, শিল্পকারখানা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততায় মুখর থাকে, সেই চট্টগ্রামই একসময় পরিণত হয়েছিল দেশের সবচেয়ে আলোচিত আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে।
জুলাইয়ের শুরুতে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দিন যত গড়িয়েছে, ততই বিস্তৃত হয়েছে তার পরিধি। নগরীর জিইসি মোড়, দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, নিউমার্কেট, আগ্রাবাদ, লালদীঘি, টাইগারপাস, অক্সিজেন মোড় থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—প্রতিটি এলাকাই যেন পরিণত হয়েছিল উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষীতে।
ষোলশহর স্টেশনের সামনের রাস্তাটা তখনো ফাঁকা, বাতাসে তখনো যুদ্ধের গন্ধ নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেই রাস্তা রক্তে ভিজবে, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পরিণত হবে রণক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই—তারিখটা এখন ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে আছে চট্টগ্রামের প্রথম রক্তক্ষরণের দিন হিসেবে।
প্রথম রক্তের দাগ: ষোলশহর ও মুরাদপুর
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সেদিন দুপুরের পর রূপ নেয় সহিংসতায়। বেলা তিনটার দিকে মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট আর ষোলশহর এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ চড়াও হয় ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি আর ককটেল বিস্ফোরণে মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সেই সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন—চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ওয়াসিম আকরাম, ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং একজন সাধারণ পথচারী। রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর কিছুক্ষণ পরই যেন প্রতিধ্বনি হয়ে আসে চট্টগ্রামের এই মৃত্যুমিছিল।
ওয়াসিম আকরাম হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের আন্দোলনের প্রথম শহীদ। জানা যায়, ঘটনার আগে ফেসবুকে তিনি সবাইকে ষোলশহরে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই ডাকেই যেন জেগে ওঠে গোটা চট্টগ্রাম। এই মৃত্যু আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা—ক্ষোভ, শোক আর প্রতিরোধের এক অদম্য সংমিশ্রণ। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের একজন অভিযুক্ত মূল ঘাতককে গ্রেপ্তারও করা হয়।
আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই ঢাকার পাশাপাশি সরব ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে পুরো নগরীতে, স্ফুলিঙ্গের মতো। পুলিশের ব্যারিকেড, টিয়ারগ্যাস আর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হামলা—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি হাজার হাজার শিক্ষার্থী আর সাধারণ মানুষের ঢল। প্রতিদিনই নতুন করে জড়ো হতেন তাঁরা আদালত চত্বরে, নগরীর প্রধান সড়কগুলোয়, স্লোগানে স্লোগানে কাঁপিয়ে তুলতেন বন্দরনগরীর আকাশ।
এক দফা থেকে চূড়ান্ত সংঘাত
আগস্টের শুরুতে আন্দোলন পৌঁছে যায় তার শেষ ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে। ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সমাবেশ থেকে আন্দোলনের সমন্বয়করা ঘোষণা দেন এক দফা দাবি—শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। একই সঙ্গে ঘোষণা আসে ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের।
এই ঘোষণার পরদিন, ৪ আগস্ট, সারা দেশের মতো উত্তাল হয়ে ওঠে চট্টগ্রামও। নগরীর তিনপুলের মাথা এলাকায় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে শুরু হয় আন্দোলনকারী ও সরকারদলীয় লোকজনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ। সেদিন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে বন্দুক, পিস্তলসহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে দেখা যায়—এমন দৃশ্য যা ইতিপূর্বে চট্টগ্রামের রাজপথে বিরল ছিল। গোলাম রসূল মার্কেটের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ। সারা দেশে সেদিন অন্তত ৫০টি জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, আর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সন্ধ্যায় জারি করে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। ৪ থেকে ৬ আগস্ট—এই তিন দিনেই সারা দেশে প্রাণ হারান তিন শতাধিকের বেশি মানুষ, স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসে যা নজিরবিহীন।
৫ আগস্ট: পতনের দিন
তবু থামেনি স্রোত। ৫ আগস্ট, সোমবার—সমন্বয়করা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির। সেদিন সকাল থেকে রাজধানীর পথে পথে নামে লাখো মানুষের ঢল, লক্ষ্য গণভবন। প্রবল গণপ্রতিরোধের মুখে দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে প্রায় ১৬ বছরের একটানা শাসনের। চট্টগ্রামের রাজপথেও সেদিন নেমে আসে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস—মাসব্যাপী উত্তেজনা, ভয় আর শোকের পর অবশেষে যেন নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায় বন্দরনগরী।
৫ জুন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে, যা পরবর্তীতে পরিচিতি পায় "জুলাই বিপ্লব" নামে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যেও এই আন্দোলনকে অভিহিত করা হয়েছে "ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থান" হিসেবে।
যে ক্ষত এখনো দগদগে
আজ, বছর ঘুরে যখন সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকানো হয়, চট্টগ্রামের রাজপথ যেন এখনো বহন করে সেই উত্তালতার স্মৃতি। মুরাদপুর মোড় কিংবা তিনপুলের মাথায় দাঁড়ালে অনেকের কানে আজও বাজে সেদিনের স্লোগান আর গুলির শব্দের প্রতিধ্বনি। ওয়াসিম আকরাম আর ফয়সাল আহমদ শান্তর নাম এখন চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে—দুই তরুণ, দুই ভিন্ন ছাত্র সংগঠনের হয়েও একই লক্ষ্যে প্রাণ দেওয়া দুই নাম। তবে ইতিহাস বলছে, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনো শঙ্কামুক্ত নন শহীদ পরিবারগুলো।
এই আন্দোলন শুধু একটি সরকার পতনের গল্প নয়—এটি একটি প্রজন্মের সাহসিকতার দলিল, যারা ভয়কে জয় করে রাজপথে নেমে এসেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের দাবিতে। চট্টগ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলো আজ ইতিহাসের অংশ, কিন্তু তার রেশ এখনো স্পষ্ট—শহরের প্রতিটি অলিগলিতে, প্রতিটি স্মৃতিফলকে, আর সেই পরিবারগুলোর চোখের জলে, যারা হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের এই মুক্তির সংগ্রামে।