
রোযা ফার্সি শব্দ। আরবিতে বলা হয় ‘সিয়াম’। ‘সিয়াম’-এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিয়তের সঙ্গে পানাহার ও ইন্দ্রিয়ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম বা রোযা।
এক মাসব্যাপী এই রোযা মানুষের মধ্যকার সকল পাপ ও অকল্যাণকে পুড়িয়ে ফেলে এবং তাকে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। সেজন্য এর নাম সিয়াম বা সংযম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোযা পালন ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর।’
রোযা মনকে পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল করে। মানব জীবনে রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র এ মাসেই নাজিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের পথপ্রদর্শক, সত্য পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।’
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পায়, তারা যেন রোযা রাখে। কিছু বর্ণনায় রমজানকে তিন দশকে ভাগ করার কথা এসেছে রহমতের প্রথম দশক, মাগফিরাতের দ্বিতীয় দশক এবং নাজাতের তৃতীয় দশক। এই তিনটি দশকের প্রত্যেকটির গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম।
রমজানের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমান, নামায ও যাকাতের পরই রোযার স্থান। সুতরাং রমজান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমজান রোযা রাখা ফরজ।
যখন তোমরা (রমজানের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা রাখবে এবং যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে, তখন রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে। রমজান মাসের রোযা রাখা ফরজ; ইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা এবং বিশ্বাস করাও ফরজ।
তাছাড়া কোনো শরয়ী ওজর ছাড়া কোনো মুসলমান যদি রমজান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে, তবে সে বড় পাপী ও জঘন্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী এবং ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদিস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী ও ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।
রমজান মাসের কোনো রোযা ইচ্ছাকৃতভাবে না রাখলে তা পাপের বিষয়। এ ক্ষেত্রে সেই রোযার কাযা (মিসিং রোযার বদল) আদায় করা জরুরি। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করা রোযার পূর্ণ মর্যাদা শুধুমাত্র তার কাযা বা পরবর্তী নেক আমলের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়, তাই বান্দাকে সতর্ক ও নিষ্ঠার সঙ্গে রোযা পালন করতে হবে।
যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমজান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করে, সে আজীবন তার সমপরিমাণ রোযা আদায় করলেও ঐ রোযার প্রকৃত মর্যাদা ও ফযিলত অর্জন করতে পারবে না।
বর্ণিত আছে ; যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমজান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করে, সে আজীবন তার সমপরিমাণ রোযা আদায় করলেও ঐ রোযার প্রকৃত মর্যাদা অর্জন করতে পারবে না।
হাদিস শরীফে বর্ণিত রোযার কিছু ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো। রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই দেবেন এবং বিনা হিসাবে দেবেন। প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক অনন্য ঘোষণা।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: “রোযা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান প্রদান করব।” (সহিহ হাদিস)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত। কিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তিনি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করবেন। বান্দা একমাত্র তাঁর জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে ।
রোযা একটি স্বতন্ত্র ও পদ্ধতিগত ইবাদত, যার বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ইবাদত থেকে ভিন্ন। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মতো নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।
হযরত আবু মুসা (রা.) হতে বর্ণিত, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেন যে ব্যক্তি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণে) পিপাসার্ত থাকে, তিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিন) পানি পান করাবেন।
হযরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমন করে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তিনি বলেন, রোযা জান্নাত লাভের পথ। তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই।রোযা বলবে, হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত রেখেছি, অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি (অর্থাৎ সে তিলাওয়াত করেছে), অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে ।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রমজানের রোযা ফরজ করেছেন এবং আমি কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীহ নামাযকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের সিয়াম ও কিয়াম আদায় করবে, সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্যভূমিষ্ঠ হয়েছিল ।
মানুষের জন্য তার পরিবার, ধন-সম্পদ, তার আত্মা, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশী ফিতনা স্বরূপ। এর কাফফারা হলো নামায, রোযা, দান-সদকা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ।
রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। এক- যখন সে ইফতার করে, তখন ইফতারের কারণে আনন্দ পায়। দুই- যখন সে তার রবের সাথে মিলিত হবে, তখন তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন সে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে এবং তিনি তাকে পুরস্কার দেবেন, তখন সে আনন্দিত হবে।
তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তাদের দোয়া কবুল করা হয়): ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, রোযাদার ব্যক্তির দোয়া ইফতারের সময় পর্যন্ত এবং মজলুমের দোয়া। তাদের দোয়া মেঘমালার উপর উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আমার ইজ্জতের কসম! বিলম্ব হলেও অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করব।
রোযা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সবরের মাস (রমজান মাস)-এর রোযা এবং প্রতি মাসের তিন দিনের (আইয়ামে বীয) রোযা অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়।
পবিত্র মাহে রমজান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। হযরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো আমলের আদেশ করুন। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ; কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই।
লেখক :
প্রাবন্ধিক,
সাবেক কমান্ডার-বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ,
সাবেক যুগ্ম পরিচালক – বাংলাদেশ ব্যাংক,



