
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর গুরুত্বপূর্ণ সাম্পান ঘাটগুলো এখন প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকৃত সাম্পান মাঝিরা তাঁদের জীবন-জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ইজারা নীতির অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কর্ণফুলী নদীর ঘাটগুলো এখন বহিরাগতদের দখলে চলে যাচ্ছে, ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজারো পেশাদার মাঝি।
সাম্প্রতিক অভিযোগ অনুযায়ী, চসিক কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের সাথে যোগসাজশ করে প্রকৃত পাটনিজীবীদের (সাম্পান মাঝি) বাদ দিয়ে বহিরাগতদের হাতে ঘাটের ইজারা তুলে দিচ্ছে। মাঝিদের দীর্ঘদিনের দাবি, “বৈঠা যার, ঘাট তার” নীতির ভিত্তিতে প্রকৃত সাম্পান মাঝিদের ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম উপেক্ষা করে দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাবশালীরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন।
মাঝিরা অভিযোগ করছেন, বহিরাগত ইজারাদাররা ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করছে। এতে প্রকৃত মাঝিরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। চাঁদা না দিলে তাঁদের নৌকা চলতে দেওয়া হয় না বা নানা রকম হয়রানির শিকার হতে হয়।
সদরঘাট, অভয়মিত্রঘাট ও বাংলাবাজারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটের ইজারা নিয়ে ইতোমধ্যে বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। মাঝিরা অভিযোগ করছেন, চসিকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন এবং মেয়রকে প্রকৃত ঘটনা জানতে দিচ্ছেন না। ফলে প্রকৃত মাঝিরা তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং জীবিকা হারানোর মুখে পড়েছেন।
ইছানগর সদরঘাট সাম্পান মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শফি বলেন, “প্রকৃত মাঝিদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের ঘাটের দায়িত্ব দেওয়া হলে আমাদের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা চসিকের কাছে বারবার দরখাস্ত দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
এ বিষয়ে কর্ণফুলী নদীর সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি এসএম পেয়ার আলী বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আমরা যদি ন্যায়বিচার না পাই, তাহলে কর্ণফুলীর সব ঘাট বন্ধ করে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।”
মাঝিরা বলছেন, চসিক যদি তাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত সাম্পান মাঝিদের অধিকার নিশ্চিত না করে, তাহলে ঘাটের অনিয়ম ও দখলদারিত্ব আরও বাড়বে। তারা চসিকের এস্টেট শাখার অনিয়মের তদন্ত ও প্রকৃত মাঝিদের তালিকা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস. এম. সরওয়ার কামাল জানিয়েছেন, “মাঝিদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে চসিকের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
শুধু মাঝিদের জীবন-জীবিকা নয়, চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলো অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। চসিক প্রতি বছর সদরঘাট থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করলেও, যাত্রীদের জন্য কোনো যাত্রী ছাউনি, পল্টন বা জেটিঘাটের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এই অনিয়মের বিরুদ্ধে মাঝিরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে সদরঘাট রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করা হয়েছিল, যেখানে বর্তমান চসিক মেয়রও মাঝিদের সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেই মাঝিরাই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সদরঘাট রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক চৌধুরী ফরিদ বলেন, “সদরঘাট চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাট। এখানে প্রকৃত মাঝিদের অধিকার রক্ষা করা না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বে।”
এদিকে, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশে চসিক অভয়মিত্রঘাটের ইজারা কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চসিকের এক কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে শর্ত তুলে নেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, চসিক যদি আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে এবং প্রকৃত মাঝিদের অধিকার নিশ্চিত করে, তাহলে ঘাট নিয়ে উত্তেজনা কমতে পারে।
কর্ণফুলী নদীর ঘাট ইজারা নিয়ে চলমান এই সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্বচ্ছ ও কার্যকর ভূমিকা জরুরি। মাঝিরা চাইছেন, সরকারি নীতিমালা মেনে প্রকৃত পাটনিজীবীদের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়া হোক। অন্যথায়, কর্ণফুলী নদীতে মাঝিদের নতুন করে আন্দোলন ও আইনি লড়াই শুরু হতে পারে, যা জনসাধারণের জন্যও ভোগান্তি বাড়াবে।



