বুধবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৬

― Advertisement ―

spot_img

ডেইরি ফার্মের বর্জ্যে শিকলবাহায় পরিবেশ বিপর্যয়, প্রশাসনের দ্বারস্থ স্থানীয়রা

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরানী পাড়া, হাজী বাড়ি সংলগ্ন এলাকা ও শিকলবাহা খালপাড়জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে ডেইরি ফার্মের অব্যবস্থাপিত বর্জ্য ফেলার...

৯১’ ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি, ভাঙনের ভয়: উপকূলবাসীর জীবনে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের বিভীষিকা আজও চট্টগ্রামের উপকূলীয় জনপদের মানুষের মনে গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়েছে। সেই ভয়াল রাতে জলোচ্ছ্বাস, প্রবল বাতাস ও বিধ্বংসী ঢেউয়ে প্রাণ হারিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ, ধ্বংস হয়েছিল অসংখ্য বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আনোয়ারা, বাঁশখালী ও সন্দ্বীপের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বরং স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব, অসমাপ্ত প্রকল্প, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং নদীভাঙনের তীব্রতায় উপকূলবাসী নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূল রক্ষায় ২০১৬ সালে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৭ কোটি টাকায়। বর্তমানে আটটি প্যাকেজের মধ্যে চারটি প্যাকেজের কাজ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এগিয়ে চলছে এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বর্ণ হক জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আনোয়ারার ৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ শেষ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উপকূলীয় অংশ অনেকটাই সুরক্ষিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের শঙ্কা, প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ না হলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আবারও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে বাঁশখালীর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে খানখানাবাদ ইউনিয়নের ডোংরা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম তার স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের সাত সদস্যকে হারান। তিনি জানান, সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ছনুয়া ইউনিয়নের বহু পরিবারে একই ধরনের শোকের ইতিহাস রয়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, পরবর্তীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা নিম্নমানের হওয়ায় বারবার ভেঙে গেছে। স্থায়ী ও কার্যকর বাঁধের অভাবে প্রতিটি বর্ষা মৌসুম ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্বল প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিওব্যাগ, কংক্রিট ব্লক ও তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এসব আংশিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। তারা দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামোর মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন।

সন্দ্বীপের দক্ষিণাংশে পরিস্থিতি আরও নাজুক। কালাপানিয়া, আমানউল্লাহ, দীর্ঘাপাড় ও উড়িরচর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রতিনিয়ত নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। ২৫ কিলোমিটার ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও কাজের ধীরগতি, অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও নিম্নমানের নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বসানো কংক্রিট ব্লক সরে যাওয়া বা ধসে পড়ায় উপকূলীয় সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উড়িরচরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। জোয়ারের সময় নোনা পানি ঢুকে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, বসতবাড়ি প্লাবিত হচ্ছে, জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

উপকূলবাসীরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেলেও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ধীরগতি ও দুর্বল অবকাঠামো তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ বা বাজেট বৃদ্ধি নয়, বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই উপকূল সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে স্থায়ী ও মানসম্পন্ন সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় ১৯৯১ সালের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হতে পারে।

উপকূলবাসীর প্রত্যাশা একটাই—অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি যেন ভবিষ্যতের বাস্তবতা না হয়। তাই দ্রুত, কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত উপকূল রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জীবন, জীবিকা ও জনপদ রক্ষায় সরকারকে আরও জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।