
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরানী পাড়া, হাজী বাড়ি সংলগ্ন এলাকা ও শিকলবাহা খালপাড়জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে ডেইরি ফার্মের অব্যবস্থাপিত বর্জ্য ফেলার ফলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক ডেইরি ফার্ম যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য খাল, নালা ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলছে। এতে পানি দূষণ, দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব, মাছের মৃত্যু এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাওয়ায় স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিকলবাহা কলেজ বাজার-চৌমুহনী এলাকা থেকে পূর্বদিকে শিকলবাহা খাল পর্যন্ত বিস্তৃত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহু পরিবার পুকুর, খাল ও জলাশয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ডেইরি ফার্মের বর্জ্য নালা দিয়ে সরাসরি খালে গিয়ে পড়ায় এসব পানির উৎস এখন মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, খালের বিভিন্ন অংশে পানির রং কালচে হয়ে গেছে, দুর্গন্ধে আশপাশে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে নুরানী পাড়া ও হাজী বাড়ির মধ্যবর্তী নালা দিয়ে প্রতিনিয়ত বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে শিকলবাহা খালে মিশছে। সম্প্রতি কিছু অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, ফলে দূষিত বর্জ্য জমে থেকে পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এতে পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাস ধ্বংস হচ্ছে এবং স্থানীয় কৃষিকাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এলাকাবাসী জানান, এই দূষণের কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষ চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ছেন। মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ হোসেন বলেন, “আমাদের এলাকার পরিবেশ এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই কঠিন। দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না, পুকুরের মাছ মরে যাচ্ছে, শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
আরেক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, “বছরের পর বছর আমরা এই সমস্যার মধ্যে আছি। অনেকবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কার্যকর সমাধান হয়নি। এখন প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া আমাদের বাঁচার উপায় নেই।”
মৎস্যচাষিরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয় কয়েকজন মাছচাষি জানান, দূষিত পানির কারণে তাদের পুকুরের মাছ ব্যাপকহারে মারা যাচ্ছে, ফলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে এলাকাবাসী ২৮ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তারা অবিলম্বে তদন্ত, অবৈধ বর্জ্য নিঃসরণ বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, “স্থানীয়দের অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দূষণের মাত্রা যাচাই করা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, শুধুমাত্র তদন্ত নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তব ও কার্যকর উদ্যোগ। তারা মনে করেন, ডেইরি ফার্মগুলোর জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, খাল পুনরুদ্ধার এবং জলাশয় সংরক্ষণে জরুরি প্রকল্প হাতে নেওয়া না হলে শিকলবাহার পরিবেশ বিপর্যয় আরও গভীর হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে শিল্প ও ফার্ম বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকলে শুধু পরিবেশ নয়, দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনপদের জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
এখন শিকলবাহাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—প্রশাসনের দ্রুত, কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষা মানেই জনজীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। শিকলবাহার মানুষ এখন একটি নিরাপদ, দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরে পেতে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায়।



