
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শুরু হওয়া অভিযান ঘিরে কয়েক ঘণ্টা ধরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ঘটনায় সিটি করপোরেশনের একাধিক গাড়িতে আগুন, পুলিশের গাড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত যন্ত্র ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সকালে ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর-১০ এলাকার ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে নামে। অভিযান শুরু হওয়ার পর ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে উচ্ছেদকারী দলের বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের সময় সিটি করপোরেশনের গাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তিনটি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ভেকু ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের খবরও পাওয়া গেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য এসেছে। একটি প্রতিবেদনে উচ্ছেদ চলাকালে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে প্রথমে আগুন লাগার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এরপর উত্তেজিত হকারদের অগ্নিসংযোগের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ফলে আগুনের সূত্রপাত ও পরবর্তী অগ্নিসংযোগের পূর্ণাঙ্গ ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
দুপুরের দিকে মিরপুর আইডিয়াল কলেজের সামনের এলাকায় ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। অন্যদিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় পুলিশ অবস্থান নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, একপর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং অপরদিক থেকে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে পিছু হটতেও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
ঘটনায় পুলিশ সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত আহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও তাদের আঘাতের মাত্রা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে একক তথ্য পাওয়া যায়নি।
মিরপুর-১০ দীর্ঘদিন ধরে ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও গণপরিবহনকেন্দ্র। ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো নিয়ে একদিকে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা এবং অন্যদিকে হকারদের জীবিকা নির্ভরতার বিষয়টি রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় না হলে বারবার উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করার অভিযানকে কেন্দ্র করে সরকারি গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই সাধারণ উচ্ছেদবিরোধী প্রতিবাদের পর্যায়ে পড়ে না। এসব ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিল, হামলা পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না এবং অগ্নিসংযোগের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এদিকে ঘটনার পরও মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন। তবে এই দাবির পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
মিরপুর-১০-এর ঘটনায় শুধু সংঘর্ষ বা গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাই নয়, উচ্ছেদ অভিযান কীভাবে পরিচালিত হলো, হকারদের সঙ্গে আগেই কী ধরনের সমন্বয় বা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, অভিযানের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি ছিল কি না এবং পুনর্বাসন বা বিকল্প ব্যবস্থার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে উচ্ছেদ অভিযান যেন আবার সহিংসতায় না গড়ায়, সে বিষয়েও প্রশাসনিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। মিরপুর-১০-এর ঘটনা শেষ পর্যন্ত কেবল একটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হিসেবে থাকবে, নাকি রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সমস্যার নতুন কোনো দিক সামনে আনবে, সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর।



