
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক মোড় দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ যানজটের জন্য পরিচিত ছিল। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে এ এলাকায় সৃষ্টি হতো দীর্ঘ যানজট, যা ভোগান্তিতে ফেলত সাধারণ যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীদের। তবে টানা ট্রাফিক অভিযানের ফলে সেই চিরচেনা জ্যাম-পয়েন্ট এখন অতীত। অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, বাস- লেগুনা স্ট্যান্ড ও রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা, ভ্রাম্যমান দোকান উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে মইজ্জ্যারটেকে ফিরেছে স্বস্তি ও শৃঙ্খলা।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাফিক জোনের আওতায় কর্ণফুলী থানা এলাকায় অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু হয়। বিশেষ করে মইজ্জ্যারটেক চত্বরকে টার্গেট করে পরিচালিত এ অভিযানে গত ১০ দিনে দেড় শতাধিক অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা ও অন্যান্য যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে। শুধুমাত্র সিএনজি অটোরিকশা প্রায় ৮০টি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা প্রায় ৭০টির উপর আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো সরিয়ে দেওয়ায় যান চলাচলে গতি ফিরেছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, সকাল ও সন্ধ্যার চাপের সময়েও মইজ্জ্যারটেক মোড়ে আগের মতো দীর্ঘ যানজট আর চোখে পড়ে না। ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) আবু সাইদ বাকার নিজে উপস্থিত থেকে সিগন্যাল টাইমিং ঠিক করা, সিএনজি চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মবহির্ভূত পার্কিং বন্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মূল সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে নির্দেশনা ফলক। তাঁর তত্ত্বাবধানে নিয়মিত পুলিশ পেট্রোল ও ট্রাফিক সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতি এলাকাটিকে প্রায় যানজটমুক্ত করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের ভাষ্যেও মিলছে স্বস্তির কথা। স্থানীয় ব্যবসায়ী এজাবত উল্লাহ বলেন, “দীর্ঘ যানজটের মইজ্জ্যারটেক চত্বর এখন যানহীন। যেন চেনায় যায় না। গাড়ির হর্নের শব্দে দোকানে বসা যেত না।এখন দেখি পুলিশ নিজেরাই দাঁড়িয়ে গাড়ি ছাড়ছেন। এটি ট্রাফিক বিভাগের বড় ধরনের একটি সাফল্য বলে মনে করছি। তবে এ সফলতা শুধুমাত্র কয়েকদিনের জন্য হলে জনগণ কাঙ্খিত সেবা পাবে না। ট্রাফিক বিভাগকে দীর্ঘস্থায়ী যানজট মুক্ত করার জন্য উদ্বেগ গ্রহণ করতে হবে।”
মইজ্জ্যারটেক চত্বরে আরেক ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জুয়েল বলছেন, “সড়ক সচল থাকায় তাদের পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে, সময় ও খরচ দুটোই কমেছে। মইজ্জ্যারটেক ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ট্রাফিক বিভাগকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা এই অভিযান ও যানজটহীন মইজ্জ্যারটেক নিয়মিত দেখতে চাই। বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদের দোসররা মইজ্জ্যারটেক চত্বরকে চাঁদাবাজির আস্তানা হিসেবে গড়ে তুলেছিল। ট্রাফিক বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি এ এলাকাটি যাতে সকলের জন্য নিরাপদ হয়ে থাকে।”
তবে এই সাফল্যের পথে বাধাও এসেছে। অবৈধ সিএনজি উচ্ছেদে গিয়ে গত ২১ ডিসেম্বর মইজ্জ্যারটেক ফসিল ফুয়েল স্টেশন এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে দায়িত্ব পালনরত দুই ট্রাফিক সদস্য আহত হন। পুলিশ জানায়, কিছু সিএনজি চালক ও বেনামে থাকা ভুয়া সংগঠনের পক্ষ থেকে হুমকিও পাচ্ছেন তারা। তবুও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) আবু সাইদ বাকার জানান, “এটি কোনো একক কর্মকর্তার কাজ নয়, বরং পুরো ট্রাফিক টিমের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। কর্ণফুলী থানা এলাকা মইজ্জ্যারটেক ও শিকলবাহা ক্রসিং যানজট মুক্ত করতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। যানজট নিরসনে সিএমপি ট্রাফিক বিভাগ বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সড়কে যান চলাচল সচল রাখতে ও যানজট মুক্ত রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
সিএমপি বন্দর বিভাগের ট্রাফিক কর্মকর্তা বলেন, মইজ্জ্যারটেক চত্বর কে যানজটমুক্ত রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং এটি তাদের প্রথম বড় সাফল্য। কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় এ উদ্যোগ আরও টেকসই হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে মইজ্জ্যারটেক মোড়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ স্থায়ীভাবেই যানজটমুক্ত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।



