
সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা গতকাল (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সংক্ষুব্ধ এক দৃশ্যের সাক্ষী হলো—র্যাবের একটি অভিযান সন্ত্রাসীদের গুলিতে পরিণত হয় রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে। ঘটনাস্থলে নিহত হন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ডেপুটি সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোয়ালেব হোসেন, আর তিনজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি। তল্লাশি অভিযান ও আহতদের চিকিৎসার মধ্যেও অপরাধ ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছে—এমনকি জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধী ব্যবস্থাপনা পটভূমিই এই ঘটনার নেপথ্য চিত্র হয়ে সামনে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে দেখা যায়, অপরাধীদের হাতে মানুষ জিম্মি হওয়ার খবর পেয়ে র্যাবের একটি দল ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ ওই পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা গভীর রাতে আচমকা র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে বন্দুক চালায়। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযানে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা আগেভাগে পজিশন গ্রহণ করে রাখে এবং পরে র্যাব সদস্যদের ওপর ঘাতক ফাঁদ পেতে গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন ডিএডি মোয়ালেব, পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার পেছনে যে ‘অভিযান-হামলা-মৃত্যু’—এর ধারা রয়েছে, তা শুধু একটি একক হামলা নয়; বরং একটি দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অপরাধী পরিকাঠামোর প্রতিফলন। জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য পরিচিত—অস্ত্রধারী দলগুলোর আবাসস্থল, গোপন লুকোনো স্থান, জিম্মি রাখা বা অপরাধী কর্মকাণ্ড চালানোর মতো কার্যকলাপের জন্য এই এলাকায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ছবি বদলায়ি নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয়দের একাংশের কথায়—জঙ্গল সলিমপুরে বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গের গা-ঢাকা কার্যক্রম কমেনি; বরং পাহাড়ি পথ, ঝোপ-জঙ্গল ও ঘন কানায় কানায় রাস্তা ভুলিয়ে দিয়ে অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘অপরাধী নেটওয়ার্ক’ তৈরি করেছেন।
ঘটনাস্থলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য—ঘন জঙ্গল, ধাপ্পাবালি, বাঁধের ভেতরে ছোট গোপন কোয়ার্টার—এসব কিছুই অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগণিত অভিযানের পরও এসব জঙ্গলভিত্তিক অপরাধী আস্তানা ভেঙে পড়েনি বলেই স্থানীয়দের বিশ্লেষণ। অপরদিকে, অভিযানের সূত্র ধরে জানা গেছে, ওই এলাকাতে অস্ত্র, গুলিসমগ্রি ও সন্দেহভাজন সদস্যদের গোপন শিবিরের অস্তিত্বের সন্দেহ রয়ে গেছে—যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
র্যাবের অভিজ্ঞ সদস্যদের চোখে যা বেশি উদ্বেগের—সেটি হলো সন্ত্রাস ও অপরাধীর সংহতি এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া। পরিবেশ, স্থানীয় জনজীবন ও অপরাধী সমাজে অপরাধীদের এমনভাবে স্থান করে নেওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আইনের প্রতি অসন্তোষ—এসব নানা ইস্যু কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই ঘটনার ফলে পুরোদমে পুনর্বার প্রশ্ন উঠেছে—কেন জঙ্গল সলিমপুরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতদূর সেখানে স্থায়ীভাবে দমন অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম?
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), মো. সিরাজুল ইসলাম, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত ও ভয়াবহ হামলা। তদন্ত চলছে এবং সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।” তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, জঙ্গল সলিমপুরের মতো গভীর বনভূমি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ অপরাধীরা আত্মগোপনে সক্ষম ও কঠিন ভূতাত্ত্বিক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।
এদিকে জিম্মি উদ্ধার ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেদে র্যাবের এই অভিযান কীভাবে ব্যর্থ হল—এটি নিয়ে প্রতিটি স্তরে প্রশ্ন উঠছে। পরিবার ও সহকর্মীরা মোয়ালেবের মৃত্যুতে আপও শোক সন্তপ্ত, অনেকেই দাবি করছেন—নিরাপত্তার অভাব এবং অপরাধী কাঠামোর প্রকৃত পরিস্থিতি পূর্বেই পুশ করা উচিত ছিল। র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানাচ্ছে, পরিস্থিতি শীতল করে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারে যৌথভাবে কাজ করা হবে—কিন্তু স্থানীয়দের মনে এই প্রশ্নটা এখন দৃঢ়: “জঙ্গল সলিমপুরের জঙ্গলে অপরাধী নেটওয়ার্ক কীভাবে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এত বড় ক্ষতি কীভাবে এড়ানো যায়নি?”



