
শুরুতেই পেনাল্টি মিস। তাতে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারি, থমকে যায় আর্জেন্টিনার আক্রমণের গতি। কিন্তু লিওনেল মেসি কি এত সহজে থামার মানুষ? কয়েক মিনিটের হতাশাকে পেছনে ফেলে ঠিকই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। তার জোড়া গোলে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জিতে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এই জয়ে নকআউট পর্বের টিকিটও অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেছে আলবিসেলেস্তেরা।
সোমবার (২২ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের আরলিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণের তীব্রতা ও পাসিংয়ের ছন্দে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের প্রথম দিকেই প্রতিপক্ষের বক্সে ফাউলের কারণে পেনাল্টি পায় তারা। স্বাভাবিকভাবেই স্পটকিকে দাঁড়ান মেসি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতিহাস গড়ার সুযোগটা যেন তখনই হাতছাড়া হয়ে গেছে—এমন ভাবনাই উঁকি দিতে শুরু করেছিল।
তবে মেসি নিজের উত্তরটা দিয়েছেন মাঠেই। পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে আর্জেন্টিনা আবারও আক্রমণের ধার বাড়ায়। প্রথমার্ধের শেষভাগে আক্রমণ গড়ে ওঠে দারুণ এক সমন্বয়ে। সতীর্থের পাস থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে বাম পায়ের নিখুঁত ফিনিশে জাল খুঁজে নেন মেসি। সেই গোলেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, আর একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে পুরুষদের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস লেখেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রিয়া কিছুটা সংগঠিত হয়ে ফেরার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ ও মাঝমাঠ তাদের বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণে বারবার অস্ট্রিয়ার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখেন মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, থিয়াগো আলমাদা ও লাউতারো মার্তিনেজরা। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে—ফল নির্ধারণের চাবিকাঠি আবারও মেসির পায়েই।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। প্রতিপক্ষের ক্লান্ত রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে আরেকটি দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় জাল খুঁজে নেন তিনি। সেই গোলেই ২-০ ব্যবধানে নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার জয়। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যাও আরও বাড়িয়ে নেন মেসি। বিশ্বমঞ্চে তার এই ধারাবাহিকতা আবারও মনে করিয়ে দিল—বয়স কেবল সংখ্যা, বড় মঞ্চে বড় খেলোয়াড়রাই পার্থক্য গড়ে দেন।
এই জয়ে দুই ম্যাচে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে উঠে গেছে আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির হ্যাটট্রিকের পর দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল—দুই ম্যাচে একাই পাঁচ গোল করে বিশ্বকাপের শুরুটা রীতিমতো ঝড়ো করে তুলেছেন তিনি। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য এটি যেমন আত্মবিশ্বাসের জয়, তেমনি প্রতিপক্ষদের জন্যও স্পষ্ট বার্তা—মেসি এখনও ফুরিয়ে যাননি, বরং বিশ্বকাপের আলোয় তিনি আগের মতোই উজ্জ্বল।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার জন্য এই হার গ্রুপের সমীকরণকে কঠিন করে তুলেছে। প্রথম ম্যাচে জয় পেলেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তারা আক্রমণে খুব বেশি ধার দেখাতে পারেনি। মাঝেমধ্যে কিছু প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি কোনো সময়ই। ফলে শেষ পর্যন্ত মেসির জাদুতেই হার মেনে মাঠ ছাড়তে হয়েছে ইউরোপের দলটিকে।
বিশ্বকাপের শুরুতেই আর্জেন্টিনার বার্তা স্পষ্ট—তারা শুধু জিততেই আসেনি, শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়েও নিজেদের সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর সেই অভিযানের সামনের সারিতে আছেন এক ও অদ্বিতীয় লিওনেল মেসি। পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু হলেও ম্যাচ শেষে আলোটা পুরোটা গিয়েছিল তার দিকেই—কারণ ইতিহাস, নেতৃত্ব আর ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা—সবকিছুই আবারও নিজের পায়ে লিখে দিলেন ফুটবলের এই মহাতারকা।



