বুধবার, জুন ৩, ২০২৬

― Advertisement ―

spot_img

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানে মার্কিন অভিযান, বাড়ছে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোরুক ও কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে...

গুপ্তধনের গল্পে বিশ্বাস, ধাপে ধাপে নিঃস্ব প্রবাসী

মইজ্জ্যারটেকে অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ
গ্রেফতার আসামি

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে ‘সীমানা পিলার ম্যাগনেট’ বা কথিত গুপ্তধনের প্রলোভন দেখিয়ে এক সৌদি প্রবাসীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে নানা কৌশল, নাটকীয়তা ও মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে ভুক্তভোগী মোঃ নুরুল আলমের কাছ থেকে অর্থ, সম্পত্তি ও ব্যবসা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে। সর্বস্ব হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে পরিবারের সদস্যদের হস্তক্ষেপে তিনি শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেন।

এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ভুক্তভোগী নুরুল আলম চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিস্তারিত জবানবন্দি প্রদান করেন। মামলাটি কর্ণফুলী থানার মামলা নং-০৪, তারিখ ০২ মে ২০২৬ এবং জিআর নং-১৭৫/২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৪০৬/৪২০/৩৭৯/১১৪/৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। জবানবন্দি রেকর্ড করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস. এম. আলাউদ্দিন মাহমুদ।

আত্মীয়তার সুযোগে প্রতারণার শুরু

ভুক্তভোগী নুরুল আলম আদালতকে জানান, তিনি ১৯৯২ সালে সৌদি আরবে যান এবং দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। অভিযুক্ত শুয়াইব তার আত্মীয় ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় দীর্ঘদিনের পরিচয় ও বিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল। সেই সুযোগ নিয়েই প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সাতকানিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের কাছ থেকে জায়গা কিনে দেওয়ার কথা বলে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও কোনো জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। পরে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নতুন নাটক।

‘গুপ্তধন’ ও ‘ম্যাগনেট বোতল’-এর গল্প

২০২৩ সালের শেষ দিকে অভিযুক্তরা নুরুল আলমকে জানায়, তার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার একটি বড় সুযোগ এসেছে। এরপর তাকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ আকতারুজ্জামান সেন্টারের সপ্তম তলায় অবস্থিত এজেএম ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর নামের একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আরও কয়েকজনের সঙ্গে।

এক পর্যায়ে তাকে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সংলগ্ন একটি পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বালতি থেকে বিশেষ একটি বোতল বের করে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, অভিযুক্তরা হাতমোজা পরে বোতলটি লাইটের কাছে নিলে আলো নিভে যায়। এই ঘটনাকে ‘অলৌকিক শক্তি’ হিসেবে দেখিয়ে বোঝানো হয় যে, এটি অত্যন্ত মূল্যবান গুপ্তধন বা ‘সীমানা পিলার ম্যাগনেট’।

এ সময় অভিযুক্তরা দাবি করে, বিদেশি ক্রেতারা এই বোতল কিনতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেবে। শুধু কিছু টাকা খরচ করলেই কোটি কোটি টাকা লাভ হবে—এমন প্রলোভন দেখানো হয়।

ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা

প্রথমে পাহাড়িদের টাকা দিতে হবে বলে ২ কোটি টাকা দাবি করা হয়। এরপর বলা হয়, বিদেশি বায়ার এলে গুপ্তধন বিক্রি হবে। তখন নুরুল আলম নিজের ভাইদের কাছ থেকে টাকা এনে ধাপে ধাপে ১ কোটি টাকা প্রদান করেন।

কিছুদিন পর নতুন গল্প তৈরি করা হয়। বলা হয়, ডুলাহাজারা থেকে গুপ্তধন আনার পথে আর্মি ক্যাম্পে সেটি আটক হয়েছে এবং ঢাকার এক আর্মি কর্মকর্তার স্ত্রী সেটি ছাড়াতে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করছেন। কখনো ১০ কোটি, কখনো ৫ কোটি টাকা দাবি করা হয়।

ভুক্তভোগী জানান, আগের টাকাগুলো ফেরত পাওয়ার আশায় তিনি আবারও প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস করেন। পরে চায়নার পার্টিকে টাকা দেওয়ার কথা বলে আরও ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়। এভাবে প্রায় দুই বছর ধরে প্রতারণার নাটক চলতে থাকে।

দোকান বিক্রি, সম্পত্তি বন্ধক

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে অভিযুক্তরা জানায়, ৬৫ লাখ টাকা দিলে গুপ্তধন চূড়ান্তভাবে ছাড়ানো সম্ভব হবে। তখন নুরুল আলম আগ্রাবাদ আকতারুজ্জামান সেন্টারে থাকা তার ১০৬ নম্বর দোকান বিক্রি করে সম্পূর্ণ টাকা অভিযুক্তদের দেন।

এরপরও শেষ হয়নি প্রতারণা। আবারও বলা হয়, আর্মি কর্মকর্তার স্ত্রী আরও ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করছেন। তখন নুরুল আলম সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েন।

পরে অভিযুক্তরা তাকে জানায়, টেরিবাজারের চারটি দোকান এবং কক্সবাজারে থাকা ২৪ শতক জমি তিন মাসের জন্য বন্ধক রাখতে হবে। তাদের সহযোগী তানিয়া বেগম নামের এক নারীর কাছে এসব সম্পত্তি বন্ধক দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী দাবি করেন, তিনি কখনো ওই নারীকে দেখেননি। শুধু অভিযুক্তদের কথায় বিশ্বাস করে দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন।

বিদেশি বায়ারের নামে নতুন নাটক

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিযুক্তরা দাবি করে, তারা অবশেষে গুপ্তধনটি উদ্ধার করেছে। এরপর বোতলটি কয়েকটি প্যাকেটে মুড়িয়ে নুরুল আলমের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তাকে বলা হয়, বিদেশি বায়াররা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে এবং এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে এসে বোতলটি কিনবে। এই আশ্বাসে তিনি আবার সৌদি আরবে ফিরে যান।

বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, বিদেশি বায়ার হিসেবে যাকে দেখানো হয়েছিল তিনি আসলে অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী।

অপহরণ, মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ

জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আগ্রাবাদ হোটেলে বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলে তাকে ডাকা হয়। তিনি কেরানিহাট থেকে বাসে চট্টগ্রাম আসার সময় মইজ্জ্যারটেক এলাকায় বাস থামিয়ে ১০-১২ জন যুবক তাকে জোরপূর্বক নামিয়ে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়।

সেখানে অভিযুক্ত শুয়াইব, মাহফুজুর রহমানসহ আরও কয়েকজন তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। তার কাছে থাকা কথিত গুপ্তধনের বোতল, ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার, ২৩০ সৌদি রিয়াল, নগদ ৮ হাজার টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের চেকবই ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা

ভুক্তভোগী নুরুল আলম আদালতে বলেন, “৩৪ বছরের প্রবাস জীবনে গড়ে তোলা সৌদি ও চায়নার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে গেছে। দোকান, সম্পত্তি, সঞ্চয় সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে পরিবারের সদস্যরা আমাকে বাধা দিয়ে আইনের আশ্রয় নিতে বলেন।”

তদন্তে নতুন তথ্য

ছিনতাইয়ের ঘটনার পর কর্ণফুলী থানায় মামলা দায়ের হলে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই মামলার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হয়। একে একে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই, চেক, জমির দলিল এবং একাধিক ব্যাংক হিসাবের নথিপত্র।

সূত্র আরও জানায়, মামলাটির তদন্ত ভিন্নখাতে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর কর্ণফুলী ও সাতকানিয়া এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘সিমানা পিলার ম্যাগনেট’, গুপ্তধন বা অলৌকিক শক্তির নামে প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এমন চক্র সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের টার্গেট করেছে।

তাদের মতে, দ্রুত ও সহজে কোটি টাকা লাভের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে থাকা প্রবাসীদের লক্ষ্য করেই এ ধরনের প্রতারণা সংঘটিত হচ্ছে।

সচেতন থাকার আহ্বান

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, গুপ্তধন, ম্যাগনেট, অলৌকিক শক্তি বা বিদেশি ক্রেতার গল্প বলে কেউ অর্থ দাবি করলে তা বিশ্বাস না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো উচিত।