
চোখের জলে, বুকভরা আহাজারিতে, হৃদয় নিংড়ানো প্রার্থনায় শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ইজতেমা। শুক্রবার (২ মে) জুমার নামাজের পর চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নতুন উপজেলা সংলগ্ন ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে তিন দিনব্যাপী এ বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজনের পর্দা নামে। ইজতেমা মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক, অলিগলি ও ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে লাখো মানুষ হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা ও কল্যাণ কামনায় অংশ নেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা, গ্রাম, শহর ও আশপাশের জেলা থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের পদচারণায় ইজতেমা মাঠ পরিণত হয় এক আত্মিক মিলনমেলায়। ভোর থেকেই দলে দলে মানুষ ময়দানে জড়ো হতে থাকেন। কেউ এসেছেন পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউবা বাস বা ট্রাকে চড়ে। শহরের যেকোনো প্রান্তে তাকালেই দেখা গেছে—ইজতেমা মুখী মানুষের ঢল।

আখেরি মোনাজাতে দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সমাজের শান্তি-সুরক্ষা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থেকে মুক্তি, রিজিকের বরকত এবং সর্বোপরি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য করুণ সুরে দোয়া করেন দেশের খ্যাতনামা তাবলিগি মুরুব্বিগণ। ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন দাওয়াতে ইসলামী’র শীর্ষ নেতা ওবায়েদ রেজা আত্তারী আল মাদানী। ফিলিস্তিন সহ বিশ্বের সকল নির্যাতিত মুসলমান ভাই বোনদের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের বদ নজর থেকে রক্ষা করার জন্য দোয়া করা হয়। চারদিক থেকে ভেসে আসে “আমিন, আমিন”—এই ধ্বনি যেন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে।
ইজতেমা আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তায় ছিল প্রশাসনের কঠোর নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিন দিনের ইজতেমায় ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেন দেশি-বিদেশি মেহমান আলেমরা। তারা তাওহিদ, রিসালাত, নামাজ, তাকওয়া ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং মুসলমানদের জীবনে এসবের গুরুত্ব সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেন।
দুপুরের তীব্র গরমে ইজতেমা ময়দানে বেশ কজন অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়।
ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা বলেন, “এমন পরিবেশে কয়েকদিন থাকা আত্মিক প্রশান্তির এক বিরল অভিজ্ঞতা। এখানে এসে মনে হয়েছে যেন জান্নাতের এক ঝলক দেখছি।”
আখেরি মোনাজাত শেষে ধীরে ধীরে মানুষ বাড়ি ফিরতে থাকেন। কারো চোখে জল, কারো মুখে প্রশান্তির হাসি—তবে সবার মনেই একটাই চাওয়া, যেন ভবিষ্যতেও এমন দাওয়াতি পরিবেশে অংশ নিতে পারেন তারা, আর নিজের জীবনে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ করতে পারেন।
চট্টগ্রাম ইজতেমা শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক ও আধ্যাত্মিকভাবে এক জাগরণের আহ্বান। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ ফিরে যেতে চায় আত্মার শান্তির কাছে, আল্লাহর কাছে।



