
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার পশ্চিমে কুতুবজোম ইউনিয়নের ছোট্ট একটি ওয়ার্ড বা গ্রাম বা দ্বীপ নামে পরিচিত সোনাদিয়া দ্বীপ। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং নিরিবিলি পরিবেশের জন্য পরিচিত এই দ্বীপকে অনেকেই প্রকৃতির এক স্বর্গ বলে আখ্যা দেন। বিস্তীর্ণ বালুচর, ম্যানগ্রোভ বন, পাখির আনাগোনা এবং সমুদ্রের ঢেউয়ে ঘেরা সোনাদিয়া দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য। ৯ বর্গ কিলোমিটারের প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এখানকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কষ্ট এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনসংগ্রামের গল্প।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনাদিয়া দ্বীপে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক হাজারের মতো ভোটার এবং প্রায় চারশত পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করে আসছে। দ্বীপটির মানুষ মূলত জেলে, লবণচাষী এবং শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রমজীবী পরিবার। বঙ্গোপসাগরে নৌকা নিয়ে মাছ ধরা, মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা এবং মৌসুমভিত্তিক লবণ চাষই তাদের প্রধান জীবিকা। অনেকেই মৌসুমভিত্তিকভাবে দ্বীপে এসে কাজ করে আবার মৌসুম শেষে মূল ভূখণ্ডে ফিরে যান।
দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত। বেশিরভাগ পরিবার টিন, বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে বসবাস করে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এসব ঘরবাড়ি সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপদ আশ্রয় কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্থায়ী কোনো অবকাঠামো না থাকায় প্রতিবার ঝড়ের সময় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে।
স্থানীয় ইউপি আকরাম হোসেন জানান, “এ গ্রামে পূর্ব পশ্চিম দুটি পাড়া যেন বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন অংশ। কোন মৌলিক অধিকার এখানকার মানুষ পায়না। সরকারও এদিকে উধাশ। আমি ইউনিয়ন পরিষদে বহুবার উন্নয়নের তাগিদ দিয়েছি। কাঁচা সড়ক করতে পেরেছি কটা ব্যাস এটুকুই। একটা মা প্রস্রাব বেদনার সময় একজন ডাক্তার বা চিকিৎসা মিলতেও কষ্টসাধ্য। একটি মাত্র বিদ্যালয় তাও ঠিকঠাক ক্লাস হয়না, শিক্ষকও আসেনা।”
সোনাদিয়া দ্বীপে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য মৌলিক সেবা নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপটিতে কার্যত কোনো কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা নেই। একটি মাত্র অস্থায়ী প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগ থাকলেও তা মানহীন কোন রকম ঠিকে থাকার মত। দুর্গম এলাকায় মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়োগ থাকলেও যাতায়াতের অজুহাতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠদান করার না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ও নিয়মিত যায় না এবং শিক্ষাবঞ্চিত অবস্থায় বড় হয়ে উঠছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাও প্রায় অনুপস্থিত। জরুরি কোনো অসুস্থতা দেখা দিলে রোগীকে নৌকায় করে মহেশখালী বা কক্সবাজারে নিতে হয়, যা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিরা দ্বীপে আসেন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে তাদের আর খোঁজ মেলে না। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ছোঁয়া এই দ্বীপে খুব একটা পৌঁছায়নি বলে মনে করেন তারা।
দ্বীপে বাজার বা স্থায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যবস্থাও নেই। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হলে বাসিন্দাদের নৌকায় করে মহেশখালী বা কক্সবাজার যেতে হয়। মহিলাদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা বা মাতৃসেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই পরিবার পরিকল্পনা। এক একটি পরিবারে একাধিক শিশু এবং অনেক শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছে যা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও সোনাদিয়া দ্বীপের মানুষের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো ইঞ্জিনচালিত নৌকা। মহেশখালীর ঘটি ভাঙা ঘাট থেকে এসব নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাটের তদারকি করছে হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি এবং তাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া ও নিয়মকানুন নির্ধারণ করা হয়। ফলে দ্বীপবাসীদের অনেক সময় নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
মসজিদ কমিটির নাম করে কমিটির কয়েকজনে ঘাটের আধিপত্য ধরে নিয়েছে। তিনটি মাত্র ইঞ্জিন চালিত নৌকায় তাও শুষ্ক মৌসুমে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অবনতি হলে তারও দেখা মেলে না। স্থানীয়দের দাবি ঘাট পরিচালনা ব্যবস্থা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য মানসম্মত নৌকা রাখতে হবে। প্রশাসন নির্ধারিত মূল্যে ভাড়া ও জরুরী প্রয়োজনে তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মোহাম্মদ রাসেদ জানান, “মূল ভূখন্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সোনাদিয়া দ্বীপ। দীর্ঘদিন এটি বনবিভাগের অধীনে ছিল। গত সরকারের আমলে Bangladesh Economic Zones Authority (BEZA) এটিকে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করে জনসাধারণের জন্য কোন প্রকল্প হাতে নেয়নি সরকার। সে প্রকল্প হাইকোর্টের রুলে বাতিল হয়েছে। দ্বীপটির উন্নয়নে এখন আমরা কাজ শুরু করেছি। জনজীবনের মান উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।”
প্রাকৃতিকভাবে সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সামুদ্রিক প্রাণী এবং ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। মাঝে মাঝে সামুদ্রিক কচ্ছপও এখানে ডিম পাড়তে আসে। পরিবেশবিদদের মতে, এই দ্বীপের পরিবেশগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এটি সংরক্ষণ করা জরুরি।
অন্যদিকে, দ্বীপটির সম্ভাবনাময় অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সময় বড় বড় কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের নজর পড়েছে সোনাদিয়ার ওপর। স্থানীয়দের দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠান দ্বীপটিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার জন্য এখানে বসবাসকারী মানুষদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মধ্যে বিরাজ করছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন অনেক পরিবার।
সোনাদিয়া দ্বীপের মানুষ তাই সরকারের কাছে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান দ্বীপে একটি স্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, নিরাপদ পানি ব্যবস্থা এবং নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হোক। পাশাপাশি একটি ছোট বাজার ও নিরাপদ ঘাট নির্মাণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম দৈনিক ইনফো বাংলা প্রতিবেদককে জানান, “সোনাদিয়া দ্বীপের জনজীবন উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। দ্বীপের বিচ্ছিন্নতা দূর করতে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের নিবন্ধন, জলবায়ু-সহনশীল নৌকা ও জাল বিতরণ এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ পাঠদানসহ কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি, দ্বীপটি Ecologically Critical Area হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, মৎস্য অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও প্যারাবন পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে, কারণ পরিবেশ রক্ষা এবং জনজীবনের উন্নয়ন এখানে অবিচ্ছেদ্য। একইসাথে, দুর্যোগ-প্রবণ এই দ্বীপে সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার ও আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম জোরদার করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের সম্পদ ও অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এই সামগ্রিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।”
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সোনাদিয়া দ্বীপ আজও উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই দ্বীপে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে সোনাদিয়া একদিন পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


