
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ইছানগর গ্রাম একসময় ছিল শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু প্রান্তিক মেরিন ডকইয়ার্ড নামক একটি প্রতিষ্ঠানের স্যান্ড ব্লাস্টিং কার্যক্রমে সেই জনপদ এখন পরিণত হয়েছে ধুলোঘরে। শিশুদের খেলাধুলা, বৃদ্ধদের স্বাভাবিক জীবনযাপন, এমনকি পরিবারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও যেন আজ দূষণের কাছে পরাজিত।
রাতভর চলা এই কার্যক্রমে বাতাস ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার শত শত শিশু ও বৃদ্ধরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযোগের পরও প্রশাসন কার্যত নীরব। পরিবেশ অধিদপ্তর ডক ইয়ার্ড এলাকা পরিদর্শন করে তাদেরকে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলে তা কার্যত হয়নি। দুই দিনের মাথায় গভীর রাতে বিকট শব্দে তারা স্যান্ড ব্লাষ্টিং মেশিন চালিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, ডকইয়ার্ডে জাহাজ মেরামতের নামে নিয়মিত স্যান্ড ব্লাস্টিং মেশিন চালানো হচ্ছে। এতে প্রচুর ধুলোবালি, বিষাক্ত কণা ও লোহাজাতীয় গুঁড়ো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের খেলনা নয়, চারপাশে এখন ধুলোই তাদের সঙ্গী। খাবার টেবিলে বসে প্লেটে ধুলো জমে যাচ্ছে, ঘরের ভেতরেও মাস্ক পরে থাকতে হচ্ছে। এ দৃশ্য শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশকে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সংকটে ফেলছে।
স্থানীয় গৃহিণী রেশমী আক্তার, শামীমা আক্তার, পারভিন আক্তার, আমেনা খাতুন সহ কয়েশ গৃহিণী জানান, “প্রতিদিন বাতাসে ধুলো ও বিষাক্ত গন্ধ ভাসছে। রান্না করার সময় জানালা খোলা যায় না। ছোট বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। খাবারের প্লেটেও পড়ছে ধুলার স্তর। বৃদ্ধরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে শিশুরা। ফ্যাক্টরি কর্মকর্তাদের অভিযোগ জানাতে গেলে তারা মামলার হুমকি দিচ্ছে স্থানীয়দের।মাস্ক পরেও সুরক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। বিষাক্ত বাতাস শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকছে।” অন্যদিকে বৃদ্ধ সৈয়দ আহমদের অভিযোগ, “রাতের বেলায় মেশিনের শব্দে ঘুমাতে পারি না। আর দিনে ধুলোয় নিঃশ্বাস নিতেই কষ্ট হয়। মনে হয় আমরা বিষ খাচ্ছি।”
অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট জান্নাতুল ফেরদৌস ডকইয়ার্ড পরিদর্শন করে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নির্দেশনা অমান্য করে পুনরায় রাতের আঁধারে কাজ শুরু করে। এতে সাধারণ মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়ে। তিনি জানান, “ডক ইয়ার্ডে পরিবেশের দূষণ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা তা অমান্য করে কাজ চলছে। আমি উদ্বোধন কর্মকর্তাদের অবিহিত করেছি। দ্রুত নোটিসের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদুল হক সুমন বলেন, “মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে দেওয়া হবে না। আমরা এই দূষণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।”
এ বিষয়ে কোন প্রকার বক্তব্য দিতে রাজি নয় প্রান্তিক মেরিন ডকইয়ার্ড কর্মকর্তাগণ।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের জানিয়েছে তারা আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রয়োজনে আমরা প্রশাসনিক সহায়তা করব।”
শিশুদের বেড়ে ওঠার জায়গা যেখানে হওয়া উচিত খেলাঘর, সেখানে ধুলোঘরে পরিণত হওয়া ইছানগর আজ এক দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ছাড়া এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।



